মহানগর রাজ্য

ডায়মন্ড হারবারে ক্যান্সারে আক্রান্ত গৃহবধূর পাশে দাঁড়ালো মহকুমা শাসক সুকান্ত সাহা

সৌরভ ত্রিবেদী,ডায়মন্ড হারবারঃ  বছর দশেক আগে স্ত্রী ও দুই ছেলে মেয়েকে রেখে বাড়ি ছেড়েছিলেন স্বামী। তারপর থেকে পরিচারিকার কাজ করে দুই ছেলে মেয়েকে বড় করছিলেন বছর বত্রিশের সবিতা রুইদাস। বছর খানেক আগে ক্যান্সার ধরার পড়ার পর থেকে শরীর ভাঙতে থাকে সবিতার। এখন তিনি বিছানা শষ্যা। অর্থের অভাবে ঠিকমত ওষুধের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার না পেয়ে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে শরীর। এমনকি অভাবের সংসারের কথা ভেবে পড়াশুনো ছাড়তে হয়েছে বছর পনেরোর মেয়ে পুস্প রুইদাস। ছোট ছেলে বছর আটেকের সন্দীপ স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস ফোরে পড়ে। প্রতিবেশীরা যে যা দিত, সেটুকু খেয়েই অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটছিল ডায়মন্ড হারবারের কানপুর ধনবেড়িয়া গ্রামপঞ্চায়েতের রাজারতালুকের বাসিন্দা রুইদাস পরিবারের মা ও দুই ছেলেমেয়ের।

কিন্তু দীর্ঘ দিনের পুরনো একটি খুনের ঘটনার তদন্তে এসে বুধবার বিষয়টি নজরে আসে দক্ষিণ ২৪ পরগনার জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডের সদস্য কবিতা বেরার। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে দারস্থ হন ডায়মন্ড হারবার মহকুমা শাসক সুকান্ত সাহার। তড়িঘড়ি সুকান্তবাবু এই অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ান। সঙ্গে সঙ্গে সবিতার দুই ছেলে মেয়েকে ডেকে সুকান্তবাবু রান্নার বেশকিছু সামগ্রি, কম্বল, ত্রিপল, চাল দেওয়ার পাশাপাশি একটি বাড়ি তৈরী করে দেওয়ারও আশ্বাস দিয়েছেন। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই স্কুলছুট পুস্পকেও স্কুলে ভর্তি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মহকুমা শাসক। এদিন সুকান্তবাবু জানান, ‘অসহায় ওই পরিবারের পাশে থাকাটা প্রশাসনিক কর্তা হিসেবে আমার কর্তব্য। আমি সেটাই করেছি। ছেলেমেয়েরা যাতে পড়াশুনো চালিয়ে যেতে পারে, তার সমস্তরকম ব্যবস্থা সরকারের পক্ষ থেকে করা হবে।’ তবে মহকুমা শাসকের তড়িঘড়ি এই পদক্ষেপে খুশি জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডের সদস্য কবিতা বেরা।

পরে রুইদাস বাড়িতে গিয়ে অসুস্থ সবিতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল তাঁর জীবন যুদ্ধের করুণ কাহিনী। তখন সবিতার বাবা নিরঞ্জন বিশ্বাস ও মা কল্পনা বেঁচেছিলেন। তিন ভাইবোনের মধ্যে মেজো সবিতা। দিদির বিহারে বিয়ে হলেও জামাইবাবু ঘরজামাই ছিল। সবিতার বিয়ের জন্য তোড়জোড় শুরু হয়েছিল বাড়িতে। পাত্রও ঠিক হয়ে গিয়েছিল। সালটা ১৯৯৯। সবিতার বাড়িতেও যাতায়াত ছিল তাঁর হবু বরের। কিন্তু সেটা মেনে নিতে পারেনি জামাইবাবু। আচমকা একদিন বিশ্বাস বাড়ির ভেতর থেকে সবিতার হবু বরের দেহ উদ্ধার হয়। পুলিশ পরিকল্পিত খুনের মামলা রুজু করে সবিতা সহ জামাইবাবু, বাবা ও মাকে গ্রেপ্তার করে। সবিতা নাবালিকা হওয়ায় পাঠানো হয়েছিল জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডে।

দীর্ঘদিন বাবা-মা ও জামাইবাবু জেলে থাকলেও অল্প দিনের মধ্যে হোম থেকে বাড়িতে ফিরেছিল সবিতা। এরপর দিদি ও ভাইয়ের উদ্যোগে জয়নগরের বাসিন্দা বাবলু রুইদাসের সঙ্গে বিয়ে হয় সবিতার। এরপর ক্যান্সারে মৃত্যু হয় দিদির। ভাই বিয়ে করে অন্যত্র থাকতে শুরু করে। বাবলু স্থানীয় ৭৬ বাস স্ট্যান্ডের কাছে একটি গ্যারেজে কাজ করতেন। দুই ছেলেমেয়ের জন্ম দেয় সবিতা। এরপরই বাবলু সংসার ছেড়ে চলে যায়। তখন সংসারের হাল ধরতে এলাকায় বাড়িতে বাড়িতে পরিচারিকার করে ত্রিপলের ছাউনী এক চিলতে বাড়িতে থেকে ছেলেমেয়েদের বড় করছিলেন। সামান্য আয় ছেলেমেয়ের মুখে খাবার ও পড়াশুনোর পিছনে খরচ হয়ে যেত। হাড়ভাঙা খাটুনির জেরে বছর খানেক আগে অসুস্থ হয়ে পড়েন সবিতা। হাসপাতালে চিকিৎসার পর জানতে পারেন, তাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছে মারণ ব্যাধী ক্যান্সার। তারপর থেকেই অচল হয়ে পড়ে সংসার। অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটতে থাকে সবিতা ও তাঁর দুই ছেলেমেয়ের। এদিন ভাঙা গলায় সবিতা বলেন, ‘জামাইবাবুর কোন খোঁজ নেই। বাবা-মায়ের জেলেই মৃত্যু হয়েছে। এখনও জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডে সেই মামলার ট্রায়াল চলছে। আমি এখন মৃত্যুর পথিক। অর্থের অভাবে ওষুধটুকু কিনতে পারছি না। প্রতিবেশীরা যে যা দেয়, সেটুকু খেয়েই থাকে ছেলেমেয়ে দুটো। আমি মরে গেলে জানি না ছেলে মেয়ে দুটোর কি হবে ?’ তবে জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডের সদস্য কবিতা বেরা জানান, ‘মামলা সংক্রান্ত ব্যপারে আজ আমি সবিতার বাড়িতে পরিদর্শণে এসে ওদের অসহায় অবস্থা দেখার পর চুপ করে থাকতে পারিনি। আমি ওর ছেলেমেয়েকে নিয়ে ডায়মন্ড হারবারের মহকুমা শাসকের দারস্থ হয়েছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে ওই পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে সমস্তরকম সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি।’

Follow Me:

Related Posts